# হিসাবরক্ষকের অফিসে দুর্ধর্ষ চুরি
# খসে পড়ছে কংক্রিট ও পলেস্তারা
# কলাম-পিলারে ফাটল
# আতঙ্কিত বিচারপ্রার্থী ও কর্মরতরা
# নতুন ভবন নির্মাণের দাবি আইনজীবীদের
ইমাম খাইর, সিবিএন :
কক্সবাজার চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কলাম ও পিলারে ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা ও কংক্রিট। প্রায় দরজা-জানালা জরাজীর্ণ। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে জং ধরা লোহার রড। অফিসগুলো যেন একেকটি পরিত্যক্ত গোডাউন। রীতিমতো জীবন ঝুঁকি নিয়ে অফিস করছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে যেতে পারে যে কোন সময়।
ভবনটির বেহাল দশা ও ঝুঁকির বিষয়টি একাধিকবার উঠে এসেছে সরকারি নথিপত্রেও। গত ১ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত বিভাগের কক্সবাজার নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো এক চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভবনটি ব্যবহার অনুপযোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, প্রতিদিন বিচারক, আইনজীবীসহ প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার মানুষের যাতায়াত হয়। ভবনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
তাছাড়া পুরোনো ও জরাজীর্ণ গঠন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) ২০২০ অনুযায়ী কক্সবাজার সিসমিক জোন-৩ বা ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৫২ সালে নির্মিত এই ভবনটি দীর্ঘকাল কক্সবাজার জেলা আদালত ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে জেলা জজ আদালতের নতুন ভবন নির্মাণের পর ২০০৯ সাল থেকে এটি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ৭ দশকেরও বেশি পুরোনো এই ভবনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করা হলেও তা টেকসই হয়নি। মাঝেমধ্যেই ছাদ থেকে কংক্রিট-পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটছে। ভূমিকম্প হলে ভবনটি ধসে পড়ার ঝুঁকি আছে।

এদিকে, গত ২২ অক্টোবর চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কার্যালয়ের হিসাবরক্ষকের অফিসে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটেছে। দরজা ভেঙ্গে নিয়ে গেছে ড্রয়ারে রক্ষিত টাকা। এই ঘটনার পরে সিজেএম কোর্টের অন্যান্য অফিসগুলোতেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
চুরির ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে সদর মডেল থানায় মামলা করেছেন চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির এম এ ই শাহজাহান নূরী।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে,
গত ২২ অক্টোবর প্রতিদিনের মতো চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণ পরিদর্শনকালে দুপুর ১২টার দিকে হিসাবরক্ষক অফিস কক্ষের দরজা ভাঙ্গা দেখা যায়। সাথে সাথে সহকারী রেকর্ডকীপার আরিফুর রহমান ও জারিকারক গফুর আলমকে সঙ্গে নিয়ে ওই কক্ষে প্রবেশ করলে টেবিল, সেলফ্ ও আলমিরায় থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ফ্লোরে এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান।
তৎক্ষনাৎ বিষয়টি হিসাবরক্ষককে অবিহিত করলে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলেন। এরপর তাঁর টেবিলের ড্রয়ার খোলে দেখেন, সেখানে রক্ষিত ৯ হাজার টাকা চুরি হয়ে গেছে।
আদালতের মতো রাষ্ট্রের এমন সংবেদনশীল এবং গুরুতপূর্ণ স্থাপনায় চুরির ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ভিন্ন কোন অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে ছুরির ঘটনাটি ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্টরা।
হিসাব রক্ষণ অফিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েন, কয়দিন আগেও ছাদের বিরাট পলেস্তারা পড়ে আহত হয়েছেন একজন। এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার।
জীর্ণশীর্ণ এই ভবনে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত থাকলে যেকোন সময় বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন আইনজীবীরা।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল মন্নান জানান, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনটি অনেকদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নতুন ভবন না হওয়ায় পুরাতন জীর্ণশীর্ণ ভবনে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তার মতে, আদালত ভবনে নৈশপ্রহরী না থাকার সুযোগ নিচ্ছে চোরসহ যাবতীয় অপরাধীচক্র। চুরির ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন আইনজীবী সমিতির এই নেতা।

আইনজীবী জুবাইরুল ইসলাম জানিয়েছেন, কেউ আসেন ট্রেজারি শাখায়, কেউ নকলখানায়; কেউ এজলাসে হাজিরা দিতে, আবার কেউ মামলার নথিপত্রের খোঁজে। প্রতিদিন নানা কাজে কক্সবাজার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনে ভিড় করেন অন্তত তিন হাজার মানুষ। অথচ আদালত ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ছাদ থেকে খসে পড়ছে কংক্রিট ও পলেস্তারা। কলাম-পিলারে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ফাটল। আর এমন দশার মধ্যেই বিচারক, আইনজীবী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চালাতে হচ্ছে নিয়মিত দাপ্তরিক কার্যক্রম।
গণপূর্ত বিভাগ ভবনটিকে ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে। ২০২৩ সালে একটি অস্থায়ী টিনশেড সেমিপাকা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন ভবন নির্মাণ নিয়ে জটিলতা কাটেনি।
বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে এই বিচারকদেরও অবস্থান করতে হয় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই। এ ছাড়া আইনজীবী, তাঁদের সহায়ক কর্মী এবং আদালতে আসা হাজারো মানুষকে প্রতিদিন এই আতঙ্ক মাথায় নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।
সরকারি তথ্যমতে, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অধীনে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, দুজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চারজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিচারকাজ পরিচালনা করছেন।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ চৌধুরী বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সারাদেশের ২৩টি জেলায় চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবন নির্মিত হবে। তবে সেটা প্রকল্প পাশ হওয়া সাপেক্ষে। ইতোমধ্যে সিজেএম কোর্টে অন্তত একটি এজলাস নির্মাণের বরাদ্দ মিলেছে। সেজন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। দু-এক মাসের মধ্যে এজলাস নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী।
